বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার ও অর্জন: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
Published on February 5, 2026 by Md. Sajjadur Rahman Suman

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় দশকের একটি শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার । এই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা । দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশের অনাগ্রহ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের মাঝেই এই সরকার তার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে । আলোচ্য প্রতিবেদনে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরের কার্যাবলি, অর্থনৈতিক অর্জন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মোকাবিলা করা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক পতন এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রধান সমস্যা । ড. ইউনূসের সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক নীতি
২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪%, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছিল । সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সংকোচনমূলক আর্থিক নীতি গ্রহণ করে এবং সুদের হার বাজারভিত্তিক করে । এর ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২ শতাংশে নেমে আসে, যা গত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন । আইএমএফ (IMF) এবং এডিবি (ADB)-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে এবং সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য ঋণ প্রবাহ সচল রেখেছে ।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন ছিল এই সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য। ২০২৪ সালের শুরুতে গ্রস রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছিল । প্রবাসীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসায় রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা পূর্ববর্তী বছরের ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি । এই বিশাল অর্থ প্রবাহ রিজার্ভকে ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারে (গ্রস) উন্নীত করতে সহায়তা করে ।
| সূচক | ২০২৩-২৪ (বিগত সরকার) | ২০২৪-২৫ (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) | প্রবৃদ্ধি/পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| রেমিট্যান্স (বিলিয়ন USD) | ২৪.৭৭ | ৩০.৩৩ | ২২.৪% বৃদ্ধি |
| মূল্যস্ফীতি (সর্বোচ্চ/গড়) | ১১.৬% | ৮.২% (অক্টোবর '২৫) | ৩.৪% হ্রাস |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (গ্রস) | < ২০ বিলিয়ন | ৩২.১৫ বিলিয়ন | ১২ বিলিয়ন বৃদ্ধি |
| রপ্তানি আয় প্রবৃদ্ধি | ২.১% | ৯.০% | ৬.৯% বৃদ্ধি |
ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও নীতিগত স্বচ্ছতা
বিগত শাসনামলে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বড় বড় ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করে । ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়।
ঋণ খেলাপি ও তারল্য ব্যবস্থাপনা
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় । দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখা সত্যটি সামনে আনা হয় যে, দেশে প্রকৃত ঋণ খেলাপির (NPL) পরিমাণ ৩৫ শতাংশের বেশি । এই স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সাহায্য করে। এছাড়া তারল্য সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপানো বন্ধ করে দেয়, যা মূল্যস্ফীতি কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে । এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে, যা এই খাতের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও ব্যবসায়িক মোড় পরিবর্তন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লাভজনক অবস্থায় ফিরে আসে, যা অতীতে 'হোয়াইট এলিফ্যান্ট' বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল ।
| প্রতিষ্ঠানের নাম | মুনাফা/আয় (২০২৪-২৫) | উল্লেখযোগ্য অর্জন |
|---|---|---|
| বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স | ৯৩৭ কোটি টাকা (মুনাফা) | ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা ও কার্গো প্রবৃদ্ধি |
| বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ | ৩৮.৩৫ কোটি টাকা (মুনাফা) | ৬ বছর পর প্রথমবারের মতো লাভজনক |
| চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ | ৫৪৬০ কোটি টাকা (রাজস্ব আয়) | রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৩১৪২ কোটি টাকা (রেকর্ড) |
| চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস | ৭৫৪৩২ কোটি টাকা (রাজস্ব) | পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯.৭১% বৃদ্ধি |
মেগা-প্রকল্পে ব্যয় সংকোচন ও সুশাসন
বিগত সরকারের আমলে নেওয়া অনেক বড় প্রকল্পকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বা 'অলাভজনক' হিসেবে চিহ্নিত করে । পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়।
এডিপি সংশোধন ও বাজেট সাশ্রয়
সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (RADP) প্রায় ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) টাকা বরাদ্দ কমিয়েছে । এমআরটি লাইন-১, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমানো হয়েছে যাতে অর্থের অপচয় রোধ করা যায় । প্রায় ২৯টি প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে যা জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনে ছিল না । তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখা হয়েছে ।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বিতর্ক
সরকার ব্যয় সংকোচনের কথা বললেও ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ প্রকল্পের ব্যয় ৪০৭ শতাংশ বেড়ে ৩৫৪.৬৫ বিলিয়ন টাকা হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন । ১৫ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পটির খরচ বৃদ্ধি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে ।
সাংবিধানিক সংস্কার ও 'জুলাই চার্টার'
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো স্থায়ীভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 'জুলাই চার্টার' (July Charter) নামক একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল চূড়ান্ত করেছে । এটি মূলত ৩০টি রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসতে না পারে ।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও নির্বাচন পদ্ধতি
জুলাই চার্টারের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো বাংলাদেশে একটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা । ৪শ আসনের একটি জাতীয় পরিষদ (নিম্নকক্ষ) এবং ১০৫ আসনের একটি উচ্চকক্ষ বা সেনেট গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে । সেনেটের সদস্যদের নির্বাচন হবে 'আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব' (Proportional Representation) পদ্ধতিতে, যা ছোট দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে । এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে ।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন
সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যা কমিশনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দিয়েছে । দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার কাজও চলমান রয়েছে ।
বিচার বিভাগ ও আইনি সংস্কার
বিগত ১৫ বছরে বিচার বিভাগ যেভাবে নির্বাহী বিভাগের অধীনে চলে গিয়েছিল, তা থেকে মুক্তি দিতে ড. ইউনূসের সরকার কয়েকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ।
| সংস্কারের ক্ষেত্র | প্রধান পদক্ষেপ | প্রভাব/ফলাফল |
|---|---|---|
| বিচার বিভাগ | পৃথক সচিবালয় গঠন ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ | বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ |
| আইন ও বিচার | ১১,৭৫৯টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার | প্রতিহিংসার রাজনীতি অবসানের উদ্যোগ |
| মানবাধিকার | এনএইচআরসি-কে পুলিশি তদন্তের ক্ষমতা প্রদান | নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি |
| সাইবার নিরাপত্তা | বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল | সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষা |
নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতা
সরকারের অনেক সাফল্য থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পুলিশের বড় একটি অংশের কর্মবিরতি এবং 'পুলিশ অ্যাপাথি' বা অনাগ্রহ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় ।
পুলিশের চ্যালেঞ্জ ও মব ভায়োলেন্স
গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের নেতিবাচক ভূমিকার কারণে জনগণের ক্ষোভ ছিল চরম । এর ফলে অনেক থানা আক্রান্ত হয় এবং ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন । পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীকেও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয় । তবুও ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে দেশে অন্তত ১২৪টি মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটে । সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মতো ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং প্রতিবেশী ভারতে উদ্বেগের সৃষ্টি হয় ।
প্রশাসনিক বাধা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সরকার সংস্কারের চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আমলা ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে । পরিবেশ রক্ষার জন্য সেন্ট মার্টিনে পর্যটন সীমিত করা বা বন্দর সংস্কারের মতো উদ্যোগগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা গেছে । ড. ইউনূস নিজে স্বীকার করেছেন যে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব এবং প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে অনেক সংস্কার প্রত্যাশিত গতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি ।
বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা
ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং নোবেল বিজয়ী হিসেবে তার বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ।
আসিয়ান ও আঞ্চলিক সম্পর্ক
বিগত সরকারের 'ভারত-নির্ভর' পররাষ্ট্র নীতি থেকে সরে এসে বাংলাদেশ একটি বহুমুখী কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে । দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান-এ (ASEAN) যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে । এছাড়া পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে বাণিজ্য ও সরাসরি জাহাজ যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে ।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বিনিয়োগ
বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি এবং আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সফল বাণিজ্য আলোচনার ফলে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের কার্যাদেশ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ।
পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই পর্যটন
সরকার টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বেশ কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যদিও তা জনমতের একাংশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে ।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সুরক্ষা
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে রক্ষায় সরকার ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসের জন্য পর্যটন নিষিদ্ধ করেছে । পর্যটকদের জন্য কিউআর-কোড যুক্ত ট্রাভেল পাস বাধ্যতামূলক করা এবং রাতে অবস্থান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে । এর ফলে প্রবাল এবং বিরল লাল কাঁকড়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন ।
উপসংহার: ইতিহাসের দায় ও আগামীর পথ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরের কার্যক্রম মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, এটি ছিল ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র গঠনের একটি নিরলস প্রচেষ্টা। ব্যাংক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, রেকর্ড রেমিট্যান্স, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা (জুলাই চার্টার) তৈরি করা এই সরকারের ঐতিহাসিক অর্জন । তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের দলীয়করণের কারণে প্রশাসনের মন্থর গতি এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে কিছুটা ফারাক তৈরি করেছে ।
ইতিহাস সবসময় তাৎক্ষণিক সাফল্যে বিচার করে না। এই সরকার সংকটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যে কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে, তার সুফল বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করবে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনই হবে এই রূপান্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা । ড. ইউনূসের সরকার প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে এবং দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব থাকলে একটি দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব। এখন সময় বলে দেবে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এই সংস্কারের ধারা কতটুকু বজায় রাখতে পারবে।
তথ্যসূত্র নির্দেশিকা
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সকল তথ্য ও পরিসংখ্যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি এবং শীর্ষস্থানীয় দেশি-বিদেশি সংবাদ সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন থেকে নেওয়া হয়েছে ।
1. Interim govt marks one year..., https://www.bssnews.net/news-flash/299891
2. One Year After the Fall..., https://www.ti-bangladesh.org/...
3. WGS 2025: Bangladesh's Interim Leader..., https://www.worldgovernmentssummit.org/...
4. BB undertakes extensive reforms..., https://www.bssnews.net/news-flash/339794
5. From Hasina to Yunus..., https://www.asiapacific.ca/...
6. 2025 Investment Climate Statements..., https://www.state.gov/...
... and 39 other sources.