Suman's Impact

স্টার্টআপ লোন: কাগজে-কলমে এক, বাস্তবে আরেক

Published on February 2, 2026 by Md. Sajjadur Rahman Suman

স্টার্টআপ লোন: কাগজে-কলমে এক, বাস্তবে আরেক

বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বলছে—স্টার্টআপকে সাপোর্ট করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? আমি নিজে কথা বলেছি BRAC Bank PLC, The City Bank PLC, Eastern Bank PLC (EBL), Midland Bank, NCC, IDLC—অনেকের সাথেই। অভিজ্ঞতা একটাই: কাগজে-কলমে স্টার্টআপ, বাস্তবে ধনীদের জন্য ঋণ।

ওয়েবসাইটে কী সুন্দর করে লেখা থাকে—

No collateral
No bank transaction required
Startup friendly
Innovation-based business

কিন্তু কাউন্টারে গেলে শর্তের পর শর্ত, ইতিহাসের পর ইতিহাস, এমন সব প্রমাণ চায়—যেগুলো একজন সত্যিকারের স্টার্টআপের থাকারই কথা না।

EBL বলে: “No minimum business age”
বাস্তবে বলে: “Revenue কোথায়?”
BRAC Bank বলে: “Startup Builder”
বাস্তবে চায়: “Proven business + established cash flow”

City, Midland, NCC, IDLC—সবাই বলছে “Startup”, কিন্তু ফাইল নড়ে শুধু যাদের আগে থেকেই টাকা, সম্পদ, শক্ত গ্যারান্টি আছে।

প্রশ্ন একটাই:

  • 👉 যদি সাপোর্ট দিতেই না চান, তাহলে স্টার্টআপ লোনের নামে এই অপশনগুলো ওয়েবসাইটে রাখেন কেন?
  • 👉 বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা কি শুধু রিপোর্ট আর ব্রোশিওরের জন্য?
  • 👉 ইনোভেটিভ আইডিয়া, টেক-ড্রিভেন স্টার্টআপ, নতুন উদ্যোক্তারা কি শুধু সেমিনারের স্লাইডেই থাকবে?

এগুলো শুধু শো-পিস প্রোডাক্ট। বাস্তবে কোনো ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্সিং নেই। স্টার্টআপ মানে যদি আগেই ধনী হতে হয়, তাহলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে কীভাবে? স্বচ্ছভাবে বলুন— আপনারা স্টার্টআপে ঋণ দিতে চান, নাকি শুধু বড় লোকদের আরও বড় করতে চান?

আমি নিজে The City Bank PLC এবং Brac Bank PLC এর ক্লায়েন্ট কিন্তু যতবার তাদেরকে বলছি যে I need startup financing তারা বলে হবে না।

বিজ্ঞাপন বনাম বাস্তবতা

বর্তমান ছক অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোকে ৪% সুদে ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও, ব্যাংকগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে এক রকম শর্ত আর বাস্তবে আদেশ আলাদা বলে অনেক উদ্যোক্তা ফাঁদে পড়ছেন। ব্যাংকগুলো নিজ নিজ ওয়েবসাইটে স্টার্টআপ ঋণ সম্পর্কে যা জানাচ্ছে তা কী এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা কী, তা আমাদের অনুসন্ধান থেকে স্পষ্ট হয়:

BRAC Bank PLC – “Startup Builder”

বিজ্ঞাপন: ২১–৪৫ বছর বয়সী উদ্যোক্তা, পরীক্ষিত বিজনেস মডেল, ৫ লক্ষ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ (সর্বোচ্চ ১ কোটি অসুরক্ষিত), সুদ ৪%।

Eastern Bank PLC (EBL) – “EBL Startup”

বিজ্ঞাপন: উদ্ভাবনী পণ্যের জন্য ২ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা, কোনো মর্টগেজ লাগবে না, ব্যবসার ন্যূনতম সময় নেই, তবে দুইজন জামানতদাতা লাগবে।

The City Bank PLC – “Startup Loan”

বিজ্ঞাপন: ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অসুরক্ষিত ঋণ, সুদ ৪%, কেবল উদ্ভাবনী ও উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন নতুন ব্যবসার জন্য।

Midland Bank PLC – “MDB Start-up”

বিজ্ঞাপন: প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা, অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই, তবে উদ্যোগ পরিচালনায় দক্ষতা দেখাতে হবে । ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১ কোটি টাকা, মেয়াদ সর্বোচ্চ ৫ বছর , সুদের হার সর্বোচ্চ ৪% পিএ সম্মানেই । জমি/সম্পত্তি জামানতের কোনো নির্দেশনা না থাকলেও ব্যাংক তাদের তহবিল থেকে ঋণ দেবে বলে বলা হয়েছে।

NCC Bank Ltd. – “Nobin”

বিজ্ঞাপন: ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তথ্য কম থাকলেও মিডিয়া রিপোর্টে জানা যায় NCC তাদের “Nobin” স্টার্টআপ তহবিল থেকে উদ্ভাবনী স্টার্টআপকে কম সুদে ঋণ দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে সংবাদে প্রকাশ যে তারা প্রথমবারের মতো একটি প্রযুক্তি স্টার্টআপকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে (নিজস্ব তহবিল থেকে) । তবে ওয়েবসাইটে অফিসিয়ালি এখনও বিস্তারিত শর্ত দেখানো হয়নি।

IDLC Finance PLC – “IDLC Start-up Loan”

বিজ্ঞাপন: নতুন ব্যবসার জন্য বিনা ইতিহাসে ঋণ দেওয়া হবে । সর্বোচ্চ ঋণ সীমা ২৫ লাখ টাকা (মেয়াদ ৫ বছর, ৩–৬ মাস ছাড়) । ICT স্টার্টআপদের জন্য “Udbhabon Loan” নামের প্যাকেজে ৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অসুরক্ষিত ঋণের কথা বলা হয়েছে । বিজ্ঞাপনে বলা হয়নি বাড়তি শর্ত, শুধু ন্যূনতম ট্রেড লাইসেন্স, পরিচয়পত্র ইত্যাদি।

কিন্তু বাস্তবতা...

এইসব বিজ্ঞাপিত সুযোগের বিপরীতে বাস্তব অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। সংবাদপত্র-সহায়তায় অনুসন্ধানে জানা গেছে: উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংকগুলোর স্টার্টআপ তহবিলে মোট ৮৪০ কোটি টাকা জমা থাকা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে পর্যন্ত মাত্র ~২৬.৯ কোটি টাকা (১১৩টি প্রকল্পে) ঋণ প্রদান হয়েছে । ২৫টি ব্যাংক একটাও ঋণ দেয়নি, বাকিদেরও ঋণের পরিমাণ খুবই নগণ্য । কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিযোগ করেছে যে অধিকাংশ ব্যাংক ঝুঁকির ভয় দেখিয়ে বরাদ্দ তহবিল দিতে অনীহা দেখায় ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে জমি বা স্থাবর জামানত লাগবে না, প্রয়োজনে শিক্ষাগত প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট বা ব্যক্তিগত জামানত দিলেই চলবে । উদ্যোক্তা হতে হবে ২১–৪৫ বছর বয়সী, ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৫ বছর, সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা একসঙ্গে না দিতেও বলা আছে (প্রকল্প অগ্রগতি অনুযায়ী তিন কিস্তিতে দিতে হবে) । কিন্তু বাস্তবে অনেক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন ব্যাংকগুলো ব্যাঙ্ক হিসাবের দীর্ঘ গতিশীলতা বা উচ্চ আয়-প্রমাণ চায়, তহবিল ব্যবহারের জটিল নিয়ম চাপায়, এবং ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ছাড়াও আর্থিক সুরক্ষা দাবি করে। এ বিষয়ে BAS‌IS’র নেতা আলমস কবীরও সতর্ক করেছেন যে পূর্বের ‘ESF’ প্রকল্পে জামানত বাধ্যতামূলক হওয়ায় ঋণ কার্যত শূণ্য মাত্রায় বিতরণ হয়েছিল । বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে জমি/অতিধনের বদলে সুযোগ-সুবিধাজনক শর্ত দিয়েছে , সেখানে বাস্তবায়নে বড় ব্যাংকগুলোকে এখনও সতর্ক থাকতে হবে যেন পুনরায় জামানতবিহীন উদ্ভাবনাত্মক ঋণ কর্মসূচি সফল হয়  ।

উপসংহারে, ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞাপিত শর্ত যেমন “জামানত ছাড়া” ঋণ, “নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ” অর্থায়ন ইত্যাদি আশা জাগালেও ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে নানাভাবে ব্যাংক নীতি ও বাস্তবের মধ্যে ফাঁক আছে  । উদাহরণস্বরূপ, সিটি ব্যাংক ৪% সুদে ১ কোটি পর্যন্ত ঋণের ঘোষণা দিলেও প্রকৃত পক্ষে শতবর্ষী ব্যাংকের অফিসে গিয়েও অনেক উদ্যোক্তা বিপাকে পড়েছেন। এসব অসঙ্গতি নিয়ে মিডিয়ায় অভিযোগ উঠে এসেছে  । ফলে উদ্যোক্তাদের হতাশার কারণ, কারণ প্রশস্ত নাগরিক সুবিধার কথা হলেও বাস্তবের নিয়মকানুন কঠোর আর জটিল।

ঋণ ও হালাল-হারাম প্রসঙ্গ

যদি ইসলামিক অপশন একদমই না থাকে (জরুরি অবস্থা)

এখানে বিষয়টা সেনসিটিভ, তাই সততার সাথে বলছি। কিছু আলেম (সংখ্যালঘু মত) বলেন, যদি:

  • ইসলামিক বিকল্প বাস্তবে পাওয়া না যায়
  • ব্যবসা না করলে জীবিকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
  • সুদ মিনিমাম হয়
  • বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হয়

তাহলে দরুরা (necessity) হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটা “হালাল” না, বরং “গুনাহ কমানোর চেষ্টা”।

এ ক্ষেত্রে করণীয়:

  • ইচ্ছা রাখবেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শোধ করে ফেলবেন
  • লাভ এলে আগে লোন ক্লিয়ার করবেন
  • সদকা বেশি করবেন